90020226_2880003762058693_7986733291707301888_o

বান্দরবানের খুমের রাজ্যে

By Sabbir Haider Shuvo

#থানচি#পদ্মমুখ#থুইসাপাড়া#দেবতাপাহাড়#ভেলাখুম#নাইখ্যাংমুখ#অমিয়খুম#সাতভাই_খুম#নাফাখুম#রেমাক্রি#সাঙ্গু#বড়_পাথর#তিন্দু#থানচি
বসন্তেরই লভিতে পরশ
এসেছি এ বৈশাখে,
মোহিনী রূপের হাতছানি দিয়ে
পাহাড় কন্যা ডাকে!
কবিতার মত সুন্দর পাহাড়ের দেশ বান্দরবনে আমরা ১১ জন

এই ট্যুরটা আমরা প্ল্যান করি সেই ২০১৪ সালে । কিন্তু কখনই সময় সুযোগ হয় নি বা কারো না কারো সমস্যা লেগেই ছিল, যে কারনে ২০১৪ সালে প্ল্যান করা ট্যুর দিতে হল এই ২০২০ সালে এসে । বিভিন্ন কারনে টিকেট কাটার পরেও অনিশ্চয়তায় ছিলাম যে আসলেই যেতে পারব তো । শুরুতে আমরা মাত্র তিন জন থাকলেও ফেসবুকে আরও ২ জন এবং বান্দরবন নেমে আরও ৬ জন পেয়ে যাই । ভাগ্য ভালই বলতে হবে কারন এই ৬ জনকে না পেলে বান্দরবন থেকে থানচি বাসে যেতে হত, সময় নষ্ট হত অনেক ।

আমাদের ১১ জনের যাত্রা শুরু হয় বান্দরবন শহর থেকে থানচির উদ্দেশে চান্দের গাড়িতে করে । আকা বাঁকা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে থানচি যেতে আমাদের সময় লাগে ৩ ঘণ্টার কিছু বেশি । মাঝে আর্মি ক্যম্প ও বিজিবি ক্যম্পে ভোটার আইডির ফটোকপি জমা দিয়ে নাম এন্ট্রি করতে হয় । থানচি নেমে আমরা খুজে বের করি আমাদের আগে থেকে কথা বলে রাখা গাইড রাজু ভাইকে । রাজু ভাইকে নিয়ে আবারো পুলিশ ও বিজিবি ক্যম্পে নাম এন্ট্রি করতে হয়। থানার ওসি আমাদের ১১ জনের একটি ছবি তুলে রাখেন। থানচিতে খাওয়া দাওয়া করে সাথে শুকনা খাবার নিয়ে আমরা নৌকায় করে রওনা হই পদ্মমুখের উদ্দেশ্যে । সাঙ্গু নদীর সৌন্দর্য আর পাহাড়ি রুপ দেখতে দেখতে ৪০ মিনিট পর আমরা পদ্মমুখে পৌঁছাই । এখান থেকে পদ্মঝিরি ধরে আমাদের হাঁটা পথ শুরু । হাঁটা শুরু করার সময় আমরা জানতাম অনেকটা পথ হাঁটতে হবে কিন্তু আমাদের কোন ধারনাই ছিল না যে উঁচু নিচু রাস্তায় ৩ টা বড় পাহাড় পার হয়ে ৬ ঘণ্টা হেঁটে থুইসা পাড়া পৌঁছাতে হবে।রপথে অনেকগুলো পাহাড়ি পাড়া পরবে যেখানে থেক বিশ্রাম নেয়া ও পানি পাহাড়ি কলা ও হাল্কা নাস্তা খেয়ে নেয়া যাবে । পাহাড়ের লোকজন খুবি আন্তরিক এবং বন্ধুপরায়ন । কাঁধের ব্যগ হাল্কা হলে আর রোদের তেজ কম থাকলে পাহাড়ি এই সুন্দর পথ যে কারো মন জুরিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট । পথে দূর থেকে দেখা যাবে তাজিংডং ও সাকা হাফং ও দেবতা পাহাড় । পদ্মমুখ থেকে থুইসাপাড়া যেতে আমাদের সন্ধ্যা হয়ে যায় । আমাদের গাইড রাজু ভাই আমাদের রুম দেখিয়ে দেন । সবাই ক্লান্তিতে কিছুক্ষনের জন্য গা এলিয়ে দেই । রাতেই পাহাড়ি ঝরনার হিম শিতল পানি দিয়ে গোসল করার পর শরীর অনেকটাই চাঙ্গা হয়ে যায় । বাঁশ ও কাঠের তৈরি দোতালা ঘরের দোতালায় আমাদের থাকার যায়গা আর নিচে বারান্দায় খাবার যায়গা । আর হ্য এখানে কোন ফোনেই নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়না টেলিটক ছাড়া । আমার ফনে জদিও টেলিটক সিম ছিল তাও আমি নেটওয়ার্ক পাইনি । গাইড রাজু ভাইয়ের সিম্ফনি ফিচার ফোনে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে অনেক কাঠখড় পুরিয়ে বাসায় একবার কল দিতে পেরেছিলাম। সবচেয়ে ভাল হয় থানচি বাজারে থাকতেই বাসায় ফোন করে বলে দেয়া যে নেটওয়ার্ক থাকবে না তিন দিন। রাতে পাহাড়ি মুরগি দিয়ে ডিনার সেরে আমরা তারাতারি শুয়ে পড়ি কারন পরদিন ভোরে আমরা রউনা হব অমিয়খুমের উদ্দেশে । এভাবেই আমাদের ভ্রমনের প্রথম দিন শেষ হয় ।দ্বিতীয় দিন খুব ভোরে উঠে আমরা ফ্রেশ হয়ে ভাত ডিম ভাজা আর ডাল দিয়ে নাস্তা করে নেই । তারপর দেবতা পাহাড়ের উদ্দ্যেশে রওনা হই । আমাদের সাথে এইদিন গাইড হিসেবে ছিলেন রাজু ভাইয়ের আত্মীয় মধু ভাই । এই ট্যুরের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ট্র্যাকিং ছিল এই দেবতা পাহাড় পাড় হওয়া, বিশেষ করে এর নামার রাস্তা, কিছু কিছু যায়গায় যা ৯০ ডিগ্রি খাড়া । উচ্চতা ভীতি থাকলে এখানে না আসাই ভাল । আমাদের সাথে একজন মাঝপথে আটকে গেছিলেন পরে অনেক অনেক কষ্ট করে আমি ও আরেকজন ভাই মিলে উনাকে নামান হয়েছে । এই পাহাড় থেকে নামার সময় ভয়ঙ্কর সুন্দরে উপভোগের অভিজ্ঞতা হবে সবার। পাথুরে পাহাড়ে সবুজের সমারোহ এবং নিচে অমিয়খুমের কলকল শব্দ শত ভয় ক্লান্তি দূর করে মনে প্রশান্তি এন দেবে। দেবতা পাহাড় থেকে নেমে হাতের ডান দিকে কিছুদুর গেলে ভেলাখুম । সে এক অপরুপ যায়গা । মনে হবে উপরওয়ালা সব সৌন্দর্য ঢেলে দিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন । বাঁশের ভেলায় করে যাওয়ার সময় দুপাশে উঁচু পাথুরে পাহাড় ও পানিতে সবুজের ছায়া পড়ে অসাধারন পরিবেশ সৃষ্টি করে। ভেলায় করে কিছুদুর গেলে নাইখ্যাংমুখ এর দেখা পাওয়া যাবে । এখান থেকেই জলের ধারা বয়ে চলেছে ভেলাখুম হয়ে অমিয়খুম ও সাতভাইখুমের দিকে । ভেলাখুম ও নাইখ্যাংমুখ দেখা শেষে আমরা যাই অমিয়খুমের দিকে । অমিয়খুমে নিজে না গেলে এই সৌন্দর্য কখনোই ভাষায় প্রকাশ করার মত নয় । যারা গিয়েছেন তারা জানেন । আমরা বেশি দেরি না করে জামা কাপর খুলে হাফ প্যান্ট পড়ে পানিতে নেমে যাই । ১ ঘণ্টার মত থান্ডা পানিতে লাফালাফি করে পারে উঠি । সাতভাই খুমে যাওয়ার খুব ইচ্ছা থাকলেও ভেলা না পাওয়ায় আর যাওয়া হয়নি। তারপর সারাদিনের ঘুরাঘুরি শেষে আবার দেবতা পাহাড়ে উঠা শুরু করি । নামা যতোটা কঠিন ছিল উঠতে মোটেও তেমন কঠিন মনে হয়নি । সহজেই আমরা পৌঁছে যাই থুইসাপাড়ায় । রাতে পাহাড়ি মুরগির বারবিকিও ও ক্যম্পফায়ার জালিয়ে আড্ডা । মনে রাখার মত কিছু সময় পার করি আমরা । থুইসা পাড়ার প্রবর্তক থুইসার সাথে অনেক্ষন কথা হয় আমাদের । অনেক হাসি খুসি মানুষ আর হাতে তামাকের চুরুট সারাক্ষনই থাকে তাঁর । আমাদের গাইড মধু ভাই ভেলাখুম থেকে একটা কালিবাউস মাছ ধরে আনেন জেতা দিয়ে আমরা রাএর খাবার সেরে নেই। এইদিনও রাতে আমরা তারাতারি ঘুমিয়ে যাই । দ্বিতীয় দিনের সমাপ্তি হয় ।তৃতীয় দিন খুব ভোরে নাস্তা সেরে আবার রওনা হই নাফাখুমের রাস্তায় । পাহাড়ি পথ এত সুন্দর হতে পারে তা থুইসা পাড়া থেকে নাফাখুম না গেলে বুঝা যাবে না ৩ ঘণ্টা হেঁটে আমরা পৌঁছে যাই নাফাখুমে । নাফাখুমের কথা আলাদা করে বলার কিছু নেই । বাংলার নায়াগ্রা হিসেবে পরিচিত নাফাখুম সবাই কম বেশি চিনেন । নাফাখুমে ১ ঘণ্টা থেকে আমরা রওনা দেই রেমাক্রির দিকে। পথে খুব সুন্দর একটা পাহাড়ি টং ঘরে থেমে রেমাক্রি ঝিরির পাশে বসে আমরা কলা ও চা খেয়ে নেই । আর কিছুক্ষণ হেঁটে পৌঁছে যাই রেমাক্রি । আবারো জামা কাপর খুলে নেমে যাই পানিতে । আমরা যখন পানিতে ঝাপাঝাপি করছি তখন আমাদের গাইড নৌকা ঠিক করেন । ১ ঘণ্টা পর আমরা নৌকায় করে রউনা দেই থানচির দিকে । পথে বড় পাথর ও তিন্দু হয়ে সুন্দরী সাঙ্গু ধরে আমরা ছুটে যাই থানচির দিকে । আড়াই ঘণ্টা নৌকা ভ্রমনের পর আমরা থাওচি বাজার পৌঁছাই । সেখান থেকে চান্দের গারি ঠিক করে গাইড রাজু ভাই এর কাছে বিদায় নিয়ে বান্দরবনের দিকে রউনা দেই । আমাদের রওনা হতে সন্ধ্যা হইয়ে গিয়েছিল টাই আর্মি ও বিজিবি ক্যম্পে অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর ছাড়া পাই । ট্যুরে ২ জনের হাল্কা ইনজুরি ছাড়া তেমন কোন সমস্যা হয়নি । তবে সবার অনেক বেশি সাবধান থাকা উচিৎ, একটু অসাবধানতায় বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে ।
এই তিনটি দিন আমরা একরকম ঘোরের মধ্যে ছিলাম। প্রকৃতি এত সুন্দর হতে পারে এখানে না আসলে কখনোই বুঝতাম না ।

পরিশেষে এইটাই বলব খাবারের প্যাকেট পানির বোতল যেখানে সেখানে ফেলে পরিবেশ দূষণ করবেন না। ডাস্টবিন না পেলে সাথেই রেখে দিন পড়ে ডাস্টবিন অবশ্যই পাবেন তখন ফেলে দিয়েন ।

Comments are closed.